
নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস। এএফপির ফাইল ছবি
ভেনেজুয়েলায় বড় ধরনের হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে। নিউইয়র্কে তাদের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র সংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরে ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসজুড়ে সামরিক ঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।
ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়া
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ বলেছেন, তাদের সরকার জানে না মাদুরো এবং তার স্ত্রী কোথায় আছেন। তিনি দ্রুত উভয়ের জীবিত থাকার প্রমাণ দেওয়ার দাবি জানান।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ বলেন, হামলাগুলো বেসামরিক এলাকায় আঘাত হেনেছে। সরকার হতাহতদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। ভেনেজুয়েলা নিজেদের ভূমিতে বিদেশি সেনাদের উপস্থিতি প্রতিরোধ করবে।
ভেনেজুয়েলার সরকার এক বিবৃতিতে ভেনিজুয়েলার ভূখণ্ড এবং বেসামরিক-সামরিক স্থাপনা ও জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ‘অত্যন্ত গুরুতর সামরিক আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার হুমকি সৃষ্টির জন্য অভিযোগ করা হয়েছে। একইসঙ্গে এই হামলাকে ভেনেজুয়ালার জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতায় জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ এবং দেশটির কৌশলগত সম্পদ, বিশেষ করে তেল ও খনিজ হরণের প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
কে এই মাদুরো এবং কেন তাকে বন্দি করা হলো?
বামপন্থি প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ এবং তার ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি অব ভেনেজুয়েলার (পিএসইউভি) রাজনীতিতে জড়িয়ে নিকোলাস মাদুরো খ্যাতি লাভ করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ২০১৩ সালে শ্যাভেজের স্থলাভিষিক্ত হন।
২০২৪ সালে মাদুরোকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। যদিও বিরোধীরা দাবি করেছেন, তাদের প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজ বিশাল ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
ভেনেজুয়েলার লাখ লাখ অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ এবং মাদক, বিশেষ করে ফেন্টানাইল ও কোকেনের চোরাচালান নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে নিকোলাস মাদুরোর মতবিরোধ রয়েছে।
ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার দুটি মাদক চক্র—ট্রেন ডি আরাগুয়া ও কার্টেল ডি লস সোলসকে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন (এফটিও) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছেন। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, মাদক চক্র কার্টেল ডি লস সোলসকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাদুরো নিজেই।
এর আগে মাদুরোকে গ্রেপ্তারের তথ্য প্রদানের জন্য পাঁচ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
মাদুরো অবশ্য মাদক চক্র কার্টেল ডি লস সোলসকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, দেশটি ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের’ আড়ালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার এবং ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল ভাণ্ডার দখলের চেষ্টা করছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন বাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেশকিছু জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ১০০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছে।
বিভিন্ন দেশের প্রতিক্রিয়া
হামলার ঘটনায় ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের মিত্ররা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করেছে রাশিয়া। দেশটি বলেছে, এ ঘটনা ‘গভীর উদ্বেগজনক ও নিন্দনীয়’।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলাকে দেশটির ‘সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে অভিহিত করেছে। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেট্রো এ হামলাকে লাতিন আমেরিকার ‘সার্বভৌমত্বের ওপর আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন। কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল ডিয়াজ-ক্যানেল এটিকে ‘অপরাধমূলক আক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ কূটনীতিক কাজা ক্যালাস জোটের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে মাদুরোর বৈধতার অভাব রয়েছে। তবে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়া উচিত। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান রাখতে হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার বলেছেন, তিনি প্রকৃত তথ্য জানতে চান এবং চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে দ্রুত কথা বলতে চান।