
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হলে আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়াতে প্রস্তুত রয়েছে ইরান।
একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনেও বড় অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।
ইরানের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বার্তা প্রচারের অংশ হিসেবে আরাঘচি বলেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি ও মূল্যস্ফীতির চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর অন্যতম কারণ হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া, যেখান দিয়ে বিশ্বে ব্যবহৃত প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে আরাঘচি লেখেন, ইরানের বিরুদ্ধে পছন্দের এই যুদ্ধের বাড়তি খরচ এখন আমেরিকানদের বহন করতে বলা হচ্ছে।
আরাঘচি সতর্ক করেন, শুধু জ্বালানির দাম নয়, যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ ও মর্টগেজ সুদের হারও বাড়তে শুরু করেছে এবং তা মন্দার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। খবর আল জাজিরার।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ আরও কটাক্ষ করে বলেন, মার্কিন জনগণ বিপুল ঋণের বোঝা নিয়ে যুদ্ধের খরচ বহন করছে।
গালিবফ মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে ব্যঙ্গ করে লেখেন, আপনারা এমন হারে ঋণের সুদ দিচ্ছেন যা ২০০৭ সালের পর দেখা যায়নি, শুধু হরমুজে যুদ্ধের অভিনয় চালাতে।
এই মন্তব্য আসে এমন সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২৫ বিলিয়ন ডলারের ৩০ বছরের বন্ড পাঁচ শতাংশ সুদে বিক্রি করেছে- যা প্রায় দুই দশকে দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে- এমন আশঙ্কায় ট্রেজারি বন্ডের আয় বেড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অন্যতম বড় অচলাবস্থা হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।
তেহরান বলছে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো চুক্তিতে প্রণালিটির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার স্বীকার করতে হবে। তবে উপসাগরীয় অন্য দেশগুলো এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি জানান, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে পেশাদার ব্যবস্থা প্রস্তুত করেছে ইরান।
ইব্রাহিম আজিজি বলেন, শুধু বাণিজ্যিক জাহাজ ও ইরানের সঙ্গে সহযোগিতাকারীরাই এই সুবিধা পাবে।
আজিজি আরও জানান, জাহাজ চলাচলের জন্য ফি দিতে হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’–এর সমর্থকদের প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে না।
যুদ্ধের প্রভাব ইরানের সাধারণ মানুষের ওপরও তীব্রভাবে পড়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। রান্নার তেল, চাল ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত এক বছরে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
খাদ্য, ওষুধ, ইলেকট্রনিক পণ্য, গাড়ি ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের দামও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ব্যাপক বেড়েছে।
শনিবার তেহরানের খোলা বাজারে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দর ছিল প্রায় ১৮ লাখ রিয়াল, যা রেকর্ড সর্বনিম্নের কাছাকাছি।
আরাঘচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতাই আলোচনায় অগ্রগতির বড় বাধা। গত মাসে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা যুদ্ধ থামাতে ব্যর্থ হওয়ার পর এই অবিশ্বাস আরও বেড়েছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের পর বেইজিংয়ের মধ্যস্থতার সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছে তেহরান।
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস বৈঠকে আরাঘচি বলেন, ইরান আলোচনায় চীনের ভূমিকা ইতিবাচকভাবে দেখছে।