
Kazi Azizul Huq
Kazi Azizul Huq
Nure Alam Masud posted:
"ইরান কেন এখনো নিউক সক্ষম নয় বা হচ্ছে না বা চাচ্ছে না এটা খুব ই বিরক্তিকর বিষয় হয়ে গেছে।"
দেখেন, একটা জিনিস আপনারা বারবার ভুলে যাচ্ছেন। ইরান একটা শিয়া রাষ্ট্র। হ্যাঁ, আবারও বলেন: "ইরান একটা শিয়া রাষ্ট্র।" বারবার বলেন, যতক্ষণ না মুখস্থ হয়। না, ঘোমটা শায়খ বা হাফি গ্যাং এর মতো করে না। তবুও, আবারও বলেন: "ইরান একটা শিয়া রাষ্ট্র।" অতএব, সে যে ফান্ডামেন্টালি আপনার-আমার থেকে আলাদা, এইটা আগে স্বীকার করেন। এরপর নিচের প্রশ্নগুলো করেন।
একটা শিয়া রাষ্ট্র কী চায়?
সুন্নিদের মেরে ফেলতে চায়? না।
সুন্নিদের কনভার্ট করে শিয়া বানাতে চায়? না।
সাহাবীদের গালিগালাজ করতে চায়? না।
গড় আয়ু বৃদ্ধি, গড় ইনকাম বৃদ্ধি, টেসলা ইলেকট্রিক গাড়ি? না।
তাহলে তারা কী চায়? তারা চায় "হুকুমাতে মাহদী" বা ইমাম মাহদীর শাসন। হ্যাঁ, এই কথাটাও বারবার বলেন। নিজেকে বারবার এইটা বলেন: শিয়ারা চায় হুকুমাতে মাহদী। বারবার না বললে আপনি নিজ ফ্রেমওয়ার্কের বাইরে আসতে পারবে না।
তো এইযে আপনার-আমার রাষ্ট্রচিন্তায় মেজর চাওয়া পাওয়া হয়ে আছে ভাত-কাপড়ের নিশ্চয়তা, ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা, পদ্মাসেতু- মেট্রোরেল- পরমানু বিদ্যুত প্রকল্প, ভালো চাকরি, একটা ফ্ল্যাট, একটা গাড়ি– বড়জোর বছরে দু-চারবার একটু পান্তাভাত খেয়ে কপালে টিপ মেরে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাওয়া– এইসবের ঊর্ধ্বে যে আমাদের আর বড় কোনো রাষ্ট্রীয়/ জাতিগত চাওয়া নাই, এইটা নিজেকে বারবার বলেন। মুখস্থ করেন। নাহলে আপনি "শিয়া রাষ্ট্র ইরান" কেন নিউক বানায় না, তা বুঝতে পারবেন না।
তো ইরানীরা কি এগুলা চায় না? তারা কি বাতাস খেয়ে থাকে? নিশ্চয়ই না। এগুলোও চায়, তবে "শিয়া রাষ্ট্র" হিসেবে তারা চায় "হুকুমাতে মাহদী"। এইটা মাথায় রেখে এখন আরেকটু পড়েন।
হুকুমাতে মাহদী মানে ইমাম মাহদী (আ.) এর শাসন। সেই মাহদী (আ.) কোথায়? সুন্নিরা বলে, তাঁর ভবিষ্যতে জন্ম হবে। কিন্তু শিয়াদের বিশ্বাস, তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ১২০০ বছর আগেই, তারপর দীর্ঘ হায়াত পেয়েছেন, তিনি 'গায়েব' হয়ে আছেন, কিন্তু দুনিয়াতেই আছেন।
ওয়েইট। এই জায়গায় এসে লেখাটা আর 'পলিটিকাল অ্যানালিসিস' টাইপ লাগতেছে না। ধর্মীয় গালগল্প/ "শিয়া মাজহাব বেচা" টাইপ লাগতেছে, তাই না? কিন্তু ভাই, দুনিয়ার ৩০-৩৫ কোটি 'শিয়া' ঠিক এই জিনিসটাতেই বিশ্বাস করে। বরং এইটা তাদের ধর্মীয় জীবনের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে আছে! আর আপনি সেই জাতির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের বিশ্লেষণ করবেন, অথচ তাদের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মাহদি/ হুকুমাতে মাহদী (মাহদীর শাসন) নিয়ে আলাপ করবেন না, তা কিভাবে হয়?
অতএব, খাওয়া-পরা, চিকিৎসা, পরমানু বিদ্যুৎ, ন্যানো টেকনোলজি, মিসাইল ইত্যাদি সবকিছুর পরেও "শিয়া রাষ্ট্র ইরান" এর বড় একটা চাওয়া রয়ে যায়। সেটা হলো ইমাম মাহদী (আ.)-কে ডেকে আনা!! কারণ তিনি 'গায়েবাত'-এ আছেন, তথা লোকচক্ষুর আড়ালে আছেন।
তো ভাই, আপনি-আমি যখন ডিডিপির উন্নতি চাই, গোটা রাষ্ট্রকে সেইদিকে পরিচালিত করি। জিডিপি ইমপ্রুভ করার অনেক মেট্রিকস আছে, তাই না? তো এবার বলেনতো, "শিয়া রাষ্ট্র ইরান", "হুকুমাতে মাহদী"-কে জাতির চূড়ান্ত লক্ষ্য বানানো ইরান– তারা ঠিক কোন কোন কাজের মাধ্যমে ইমাম মাহদী (আ.)-কে ডেকে আনতে চায়?
গডলেস এথিস্ট অ্যাগনস্টিক অ্যানাল-ঈস্ট যারা, তারা এগুলো আপনাকে বলবে না। এগুলো তাদের অ্যান্টেনায় ধরার বিষয় না। কিন্তু এদ্দিনে ইন্টারনেটের কল্যানে খোমেনী-খামেনী-রাইসী-নাসরুল্লাহদের যতটুকু চিনেছেন, নিশ্চয় বুঝে গেছেন যে, তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে তারা শতভাগ নিষ্ঠাবান। ধর্মকে "রাজনীতির স্বার্থে নিছক শ্লোগান" হিসেবে ব্যবহার করার মানুষ তারা না।
এবার আবারও বলেন: "ইরান একটা শিয়া রাষ্ট্র, ইরান একটা শিয়া রাষ্ট্র, ইরান একটা শিয়া রাষ্ট্র।" তারা– "ইমাম মাহদীকে ফিরায়ে আনতে চায়।" তারা– "হুকুমাতে মাহদী চায়।"
ওয়েইট। ইরান কেন নিউক বানায় না, তার জবাবে এইসব গল্প কেন? সহজ উত্তরটা তো এমন যে: "তারা বোকা দাম্ভিক ফতোয়াবাজ, একটা ফতোয়া দিয়ে ফেলে লজ্জায় এখন ফিরাতে পারতেছে না তাই দেশ যুদ্ধে পড়ে গোল্লায় যাইতেছে।"
উঁহু। এমন 'আবেগী' বিশ্লেষণ দিলে হবে? যে লারিজানিদের ফিলোসফির উপরে লেখা বই পশ্চিমাদের পাঠ্য, সে লারিজানিরা এমন বোকা? তারা কি "জোরে আমিন বলা" নিয়ে মাথা ফাটানো জাতি?
অতএব, "শিয়া রাষ্ট্র ইরানের" সুনির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা আছে, ইমাম মাহদী (আ.)-কে ফিরায়ে আনার। অথবা, তাদের ভাষায় বললে: "ইমাম মাহদী (আ.) এর আত্মপ্রকাশ (যুহুর)।" আপনারা কি সেগুলো কখনো পড়েছেন? ইরানের ইসলামী বিপ্লব যে সুনির্দিষ্ট ৩টি ধাপে ইমাম মাহদী (আ.)-এর যুহুর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে চায়? যার প্রথম ধাপ ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েছে? এবং তাদের একটি 'বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি' (worldview) আছে? মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পতনের সাথে সাথে যা আপনাদের চোখে আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দিবে?
"তবুও নিউক না বানানোর যুক্তিসঙ্গত উত্তর তো পেলাম না ভাই।"
না, পেলেন না। কারণ এখনও আপনি ঐযে খেয়ে-পরে বাঁচা জিডিপির মেট্রিক-অলা ব্রেইন দিয়ে ভাবতেছেন। শিয়া থট ফ্রেমওয়ার্কে ভাবতেছেন না। যে থট ফ্রেমওয়ার্ক "কট্টর ধর্মরাষ্ট্র" তৈরি করতে চায়। না না, বরং এভাবে পড়েন: ইসলামী শরীয়াভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা চায়, যেখানে 'সারভাইভাল' এর অজুহাতে 'ফতোয়াকে' পাশে ঠেলে দেয়া হয় না। কেননা ফতোয়াকে পাশে ঠেলা জাতির ইখলাস থাকে না। আর ইখলাসবিহীন শিয়াদের কাছে ইমাম মাহদী (আ.) ধরা দেয় না।
না ভাই, রুহুল্লাহ খোমেইনী কর্তৃক সালমান রুশদীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়াটা কোনো পলিটিকাল স্টান্টবাজি ছিলো না। আপনাদের রাষ্ট্রে তো ধর্মীয় ফতোয়া টাকায় বিক্রি হয়, এজন্যে ঐটাকে স্টান্টবাজি বলে মনে হয় (জাকির নায়েকের ব্যাখ্যা)। বিপ্লবের স্থপতি ইমাম রুহুল্লাহ খোমেইনী এই ফতোয়া দেবার পরে ইউরোপের সব দেশ অ্যাম্ব্যাসাডর প্রত্যাহার করে নিয়েছিলো, ইরানের 'রাজনৈতিক', 'অর্থনৈতিক', 'কূটনৈতিক' ক্ষতি হয়েছিলো একটি ফতোয়ার কারণে। যেভাবে আপনাদের চোখে এখন ইরানের সামরিক ক্ষতি হচ্ছে/ জান-মালের ক্ষতি হচ্ছে শহীদ খামেনীর একটি ফতোয়ার কারণে (নিউক হারাম ফতোয়া)!
কিন্তু ভাই, ফতোয়া তো ফতোয়া-ই। শরীয়াহ তো শরীয়াহ-ই। যে জাতি দিনে চৌদ্দবার দরুদ পড়ে "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, ওয়া আলে মুহাম্মাদ", আর তার সাথে জুড়ে দেয়: "ওয়া আজ্জিল ফারাজাহুম" (অর্থ: এবং তাঁর আগমন ত্বরান্বিত করুন)– সেই জাতি তো জিডিপি ইমপ্রুভমেন্ট আর উন্নত মেডিকেল কেয়ারের চেয়েও অনেক বেশি করে চায় একজন মানুষকে– তাকে খুশি করতে– তার নাম ইমাম মাহদী (আ.)! কারণ তাদের বিশ্বাস তিনি জীবিত, আল্লাহ তাঁর কাছে ও ইমামগণের কাছে ও রাসুল (সা.)-এর কাছে তাদের আমলনামা নিয়মিত উপস্থিত করেন!
সে আপনি ভাই এটাকে কুফরি আক্বিদা বা যা-ই বলেন না কেন, যাদের ছোটবেলা থেকে উঠতে বসতে ইমাম মাহদী (আ.)-কে এতটা ঘনিষ্ঠ নেতা, অভিভাবক, মাথার উপরের ছায়া হিসেবে জানা হয়েছে, তাদের কাছে ফতোয়ার মূল্য আছে ভাই। "ফতোয়ার কারণে" রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সামরিক ক্ষতির ইতিহাস তো ইরানে আজকে নতুন না, ভাই!
"একদিন আমেরিকার সাথে আমাদের যুদ্ধ হবে। সে যুদ্ধে আমেরিকা সারা পৃথিবী থেকে তার শক্তি মোতায়েন করবে আমাদের বিরুদ্ধে। তখন যা ঘটবে, তাতে ঘাবড়াবে না। সে যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হবে। সারা পৃথিবী দেখবে ইরানের রাজকীয় মর্যাদা। সে যুদ্ধের পর আমেরিকাকে কেউ আর ভয় পাবে না।"
– শহীদ রাহবার ইমাম সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী (র.), ২০০৬ সাল, ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর বিজয়ের পরে।
ইরান নিউক না বানানোতে আপনি বিরক্ত হয়ে যাচ্ছেন? শিয়াদের চাওয়া-পাওয়ার কেন্দ্র হয়ে আছে তো ইমাম মাহদী (আ.)-এর সন্তুষ্টি (আবার শিরক ভাইবেন না!)– অতএব ফতোয়া, ইসলামী যুদ্ধনীতি, এগুলো তাদের কাছে খুবই সিরিয়াস বিষয়, কারণ ইমাম মাহদী (আ.) অসন্তুষ্ট হবেন, আল্লাহ রাসুল (সা.) অসন্তুষ্ট হবেন, কেননা আল্লাহ তাদেরকে আমাদের আমলনামা দেখান।
কিন্তু আমরাতো সেগুলো বিশ্বাস করি না। অতএব আমাদের রাসুল (সা.) অসন্তুষ্ট হলেই বা কী? দুনিয়ায় টিকে থাকার জন্য ফতোয়ায় একটু কম্প্রোমাইজ তো করাই চলে, নাকি?
আপনারা শিয়া মুসলমানদেরকেই চিনেন নাই!
আবারও বলেন: "ইরান একটা শিয়া রাষ্ট্র, তাদের লক্ষ্য হুকুমাতে মাহদী।" বারবার বলেন, বারবার বলেন।