
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, পহেলা ফাল্গুন, বিশ্ব ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসকে সামনে রেখে বড় বাজারের আশায় দিনরাত পরিশ্রম করছেন যশোরের গদখালীর ফুলচাষিরা। তবে উৎসবের মৌসুম এলেও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা পাওয়া যাবে কি না-এই দুশ্চিন্তা কাটছে না চাষি ও ব্যবসায়ীদের। তাদের আশঙ্কা, নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ না হলে ফুলের বাজার বড় ধরনের ধসের মুখে পড়তে পারে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রমজানের শুরুতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পড়ে যাওয়ার বিষয়টি, যা লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ও আশপাশের এলাকা এখন রঙিন ফুলে ভরে উঠেছে। মাঠজুড়ে ফুটে আছে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাস ও জারবেরার নানা রঙের ফুল। বাতাসে ভাসছে ফুলের ঘ্রাণ। তবে এবারের ব্যস্ততা অন্য বছরের চেয়ে আলাদা। কারণ, ক্যালেন্ডারে এবার শুধু বসন্ত আর ভালোবাসা দিবস নয়, যুক্ত হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনও।
নির্বাচনের পরপরই রয়েছে পহেলা ফাল্গুন ও বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। নির্বাচনে প্রার্থীদের বরণ, পথসভা ও বিজয় মিছিলে ফুলের চাহিদা থাকে উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে গাঁদা ও রজনীগন্ধার চাহিদা থাকে বেশি। আবার বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসে গোলাপের বাজার থাকে তুঙ্গে। সব মিলিয়ে তিনটি বড় উপলক্ষ ঘিরে ফুলের চাহিদা আকাশচুম্বী হওয়ার আশা করছেন এ অঞ্চলের হাজার হাজার ফুলচাষি।
তবে সম্ভাবনার এই ছবি যতটা উজ্জ্বল, শঙ্কার দিকটাও ততটাই স্পষ্ট। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাজার বসার দিন ও রমজানের সময়-সবকিছু মিলিয়ে হিসাব মেলাতে গিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে রঙিন স্বপ্ন ম্লান হয়ে যেতে পারে।
পানিসারা এলাকার ফুলচাষি আজিজুর রহমান বলেন, মাঠে পর্যাপ্ত ফুল আছে এবং আবহাওয়াও অনুকূলে। নির্বাচন ও উৎসবকে সামনে রেখে পরিচর্যা ঠিকভাবেই চলছে। নির্বাচন আর উৎসব একসঙ্গে হওয়ায় ফুলের চাহিদা বাড়বে এবং দামও ভালো পাওয়া যাবে।
তিনি জানান, বর্তমানে যে গোলাপ তিন টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে, তা ১৫ থেকে ২৫ টাকা পর্যন্ত উঠতে পারে। তবে আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসের মূল বাজার বসে ১০ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হওয়ায় এবার ওইদিন বাজার বসবে না। ১১ ফেব্রুয়ারি বাজার কতটা জমবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। আর নির্বাচনের দিন কোনো গোলযোগ হলে পুরোপুরি লোকসানের মুখে পড়তে হবে।
গদখালী এলাকার ফুলচাষি মঞ্জুর আলম বলেন, প্রতি বছর বসন্ত উৎসব, ভালোবাসা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বাজারের জন্য চাষিরা অপেক্ষা করে থাকেন। এই সময়েই সবচেয়ে বেশি ফুল বিক্রি হয় এবং সারা বছরের লাভ-লোকসানের হিসাব মেলে। তবে চলতি বছর তিনটি উৎসবের সঙ্গে জাতীয় সংসদ নির্বাচন যুক্ত হওয়ায় চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে শঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে এবং পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকলে গদখালীর ইতিহাসে এবার রেকর্ড পরিমাণ ফুল বিক্রি হতে পারে। অন্যথায় পরিস্থিতির অবনতি হলে তা চাষিদের জন্য বড় লোকসানের কারণ হবে।
গদখালী ফুল চাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর জানান, চলতি মৌসুমের শুরু থেকে ফুলের বাজার ভালোই যাচ্ছে। আবহাওয়াও অনুকূলে এবং মাঠে প্রচুর ফুল রয়েছে। এ কারণে চলতি মৌসুমে শতকোটি টাকার বেশি ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে কি না, তা সংশয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের আগে ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে পবিত্র মাহে রমজান শুরু হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, রমজানের কারণে অনেক অনুষ্ঠান সীমিত আকারে হবে, ফলে ফুলের চাহিদা কমতে পারে। পাশাপাশি বসন্ত ও ভালোবাসা দিবসের আগে নির্বাচন থাকায় বাজার ও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবুও সব আশঙ্কা কাটিয়ে ভালো দাম মিলবে এবং লাভবান হওয়া যাবে এমনটাই আশাই করেছেন চাষিরা।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, যশোর অঞ্চলে প্রায় সাত হাজার চাষি ৬৪১ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ করেন। এখানে ১৩ ধরনের ফুলের বাণিজ্যিক চাষ হয়, যা দেশের মোট ফুলের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশ পূরণ করে।