
ঈদুল আজহার টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের ঢলে মুখর হতে যাচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত। ইতোমধ্যে তারকা মানের হোটেলগুলোর অর্ধেকের বেশি কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, দীর্ঘ ছুটিতে জমে উঠবে পর্যটন বাণিজ্য, আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠবেন লাখো ভ্রমণপিপাসু। একই সঙ্গে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সৈকতজুড়ে নেওয়া হয়েছে বহুমাত্রিক ব্যবস্থা বলে জানিয়েছে লাইফ গার্ড সংস্থা ও ট্যুরিস্ট পুলিশ।
একদিকে সবুজে ঘেরা পাহাড়, অন্যদিকে নীল সমুদ্র-আর মাঝখানে দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা কক্সবাজার যেন পর্যটকদের জন্য এক অনন্য আকর্ষণ। পাহাড়কেন্দ্রিক বিনোদনের পাশাপাশি সৈকতজুড়ে বিরাজ করছে অন্যরকম প্রাণচাঞ্চল্য।
স্বচ্ছ নীল জলরাশি, বিস্তীর্ণ বালুচর আর লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি-প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সহজেই টানে ভ্রমণপিপাসুদের। সাগরের নোনাজলে ভেসে চলা সাম্পান আর সৈকতের নির্মল পরিবেশ যেন বাড়িয়ে দেয় কক্সবাজারের সৌন্দর্য। তাই ঈদের টানা ছুটি পেলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকদের প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে এই সমুদ্রসৈকত।
এবার ঈদুল আজহায় দীর্ঘ ছুটি থাকায় আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছে হোটেল-রিসোর্টগুলো। নতুন সাজে সেজেছে পর্যটন কেন্দ্রগুলোও। ইতোমধ্যে তারকা মানের হোটেলগুলোর অর্ধেকের বেশি কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, ঈদের ছুটিতে পর্যটকের ভিড়ে চাঙা হবে পর্যটনখাত।
হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী বলেন, এবার ঈদুল আজহা বর্ষাকালে হওয়ায় কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্ষাকালের উত্তাল সমুদ্রের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করতে সবাইকে কক্সবাজারে আসার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের জন্য বিশেষ ছাড় ও সর্বোচ্চ ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যারা এবার কক্সবাজার ভ্রমণে আসবেন, তারা বর্ষাকালের সাগরের মনোমুগ্ধকর রূপ ও উত্তাল ঢেউয়ের সৌন্দর্য আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
হোটেল কক্স-টুডের ব্যবস্থাপক আবু তালেব শাহ বলেন, ঈদকে সামনে রেখে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে হোটেল কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। তবে এ সময় যে পরিমাণ বুকিং হওয়ার কথা ছিল, এখনো পর্যন্ত সেই প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বুকিং পরিস্থিতি আরও ভালো হবে এবং পর্যটকদের উপস্থিতি বাড়বে।
কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ সড়ক হোটেল-মোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, অন্য বছরগুলোতে কোরবানির ঈদের ১০ থেকে ১৫ দিন আগেই বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগ শুরু হতো। এবার তেমন সাড়া নেই। এখন পর্যন্ত বুকিং হয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ।
হোটেল-মোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানান, কক্সবাজারে বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্টহাউস ও রেস্টহাউস পর্যটকদের সেবায় প্রস্তুত রয়েছে।
এদিকে, বর্ষা মৌসুমে সাগর কিছুটা উত্তাল থাকায় সমুদ্রস্নানে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে লাইফ গার্ড কর্মীরা। তারা পর্যটকদের নির্দেশিত জোনে নামা এবং লাইফ গার্ডের পরামর্শ মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
সি-সেইফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রজেক্ট কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ঈদ পরবর্তী টানা পাঁচ থেকে ছয় দিনের সরকারি ছুটিতে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে লাখো পর্যটকের সমাগম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ সময় সি-সেইফ লাইফ গার্ড সার্ভিস ও সিআইপিআরের পক্ষ থেকে ২৭ জন প্রশিক্ষিত লাইফ গার্ড উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। পাশাপাশি ১০ জন স্বেচ্ছাসেবক রাখা হয়েছে এবং বিভিন্ন সার্ফ ক্লাব থেকেও অতিরিক্ত ভলান্টিয়ার যুক্ত করা হবে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ জন লাইফ গার্ডকে সুগন্ধা, লাবণী ও কলাতলী সৈকতে মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট টিমের মাধ্যমে পর্যটকদের সচেতন করতে তিনটি পয়েন্টে প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হবে। জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় সমন্বিতভাবে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা না ঘটে, সে লক্ষ্যেই কাজ করা হবে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ জানিয়েছে, ঈদের ছুটিতে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈকত ও পর্যটন স্পটজুড়ে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি। হয়রানি ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাইয়ান বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যাপক নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৮০ জনের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে। মূলত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী সৈকতকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। পাশাপাশি ইনানি, পাটুয়ারটেক ও হিমছড়িতেও নিয়মিত পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
তিনি আরও বলেন, দুই পালায় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ করে রাত ৮টার পর পর্যটকদের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত নজরদারি চালানো হবে, যাতে ছিনতাইসহ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে। এ লক্ষ্যে বিশেষ টিমও নিয়োগ করা হবে। এছাড়া ইনানিতে অবস্থিত জোন অফিসের মাধ্যমে ইনানি, পাটুয়ারটেক ও হিমছড়ি এলাকায় সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
ঈদকে সামনে রেখে প্রস্তুত করা হয়েছে হিমছড়ি, ইনানী, পাতুয়ারটেক, মেরিন ড্রাইভ ও ফিশ অ্যাকুরিয়ামসহ ১২টির বেশি পর্যটনকেন্দ্র।