
দেশে আগামী মাসের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থি দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দলটির সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকরা। ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) প্রকাশিত ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার নিষিদ্ধ হয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সর্বশেষ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময় নিষিদ্ধ ছিল দলটি। ২০২৪ সালে ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে।
জামায়াত অতীতে শরিয়াভিত্তিক শাসনব্যবস্থা, নারীদের কাজের সময় কমানোর মতো অবস্থান নিলেও সাম্প্রতিক সময়ে তারা দুর্নীতিবিরোধী রাজনীতিকে সামনে এনে নিজেদের ভাবমূর্তি বদলানোর চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে মূলধারার রাজনীতিতে প্রবেশ করছে দলটি।
প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট পরিবর্তনের সাথে সাথে মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, তারা ইসলামপন্থি দলগুলোর সাথে কাজ করার জন্য প্রস্তুত। একটি অডিও রেকর্ডের বরাতে বলা হয়েছে, গত ১ ডিসেম্বর ঢাকায় নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে একটি বন্ধ বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের এক কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশ এখন ‘আরও ইসলামপন্থার দিকে ঝুঁকছে’ এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো করবে।
ওই কূটনীতিক আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জামায়াতকে বন্ধু হিসেবে দেখতে চায় এবং দলটি যদি শরিয়া আইন চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে, তাহলে ওয়াশিংটনের হাতে চাপ প্রয়োগের শক্তিশালী উপায় আছে। তার ভাষায়, ‘এমন কিছু হলে যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেবে’।
শরিয়া আইন নিয়ে সাংবাদিকের উদ্বেগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, তারা শুধু জামায়াত নয়— হেফাজতে ইসলাম এবং ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গেও হয়ত যোগাযোগ করবেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই তারা আমাদের বন্ধু হোক। কারণ আমরা চাই আমাদের কাছে এমন সুযোগ থাকবে আমরা ফোন দিয়ে বলব ‘আমরা কিন্তু যা বলেছি সেভাবে ব্যবস্থা নেব।’
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র শরিয়া আইন কার্যকর হতে দেবে না জানিয়ে ওই কূটনীতিক বলেন, ‘বাংলাদেশের পুরো অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রে ২০ শতাংশ রফতানি-নির্ভর করে পোশাক শিল্পের ওপর। যদি বাংলাদেশ নারীদের বলে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করতে পারবেন না, তাদের বের করে দেয় এবং শরিয়া আইন চালু করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাকের আর কোনো অর্ডার নেয়া হবে না। আর অর্ডার না থাকার মানে হলো বাংলাদেশের অর্থনীতিও টিকবে না।’
কিন্তু জামায়াত শরিয়া আইন চালু করবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জামায়াত এটা করবে না। কারণ দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এবং উচ্চশিক্ষিত অনেক লোক রয়েছে। আমরা তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেব শরিয়া আইন করলে কি হবে।’
এ বিষয়ে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র মনিকা শাই বলেন, ডিসেম্বরের ওই বৈঠকটি ছিল নিয়মিত ও অফ-দ্য-রেকর্ড আলোচনা। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিয়েই কথা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট দলকে সমর্থন করে না এবং জনগণের ভোটে নির্বাচিত যেকোনো সরকারের সঙ্গেই কাজ করবে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুখপাত্র মোহাম্মদ রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত কূটনৈতিক বৈঠকের ব্যাপারে আমরা কোনো কথা বলি না।’
বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ বাড়ানো হলে ভারতের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে। আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ হলো বাংলাদেশে জামায়াতের প্রভাব। ভারত দলটিকে পাকিস্তানপন্থী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে।
তবে মার্কিন দূতাবাস বলছে, বাংলাদেশের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের ওপর বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। ওয়াশিংটনের মতে, ঢাকা ও নয়াদিল্লির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আলাদাভাবে পরিচালিত হয়।