
সনদের অভাবে আটকে আছে বাংলাদেশের ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের চামড়া রফতানির সম্ভাবনা। ১০ বছর আগের মতো একই পরিমাণ চামড়া রফতানি করলেও বাজারমূল্যে পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। ট্যানারি মালিকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সরকারের উদাসীনতার কারণেই রফতানি বাড়লেও সে অনুযায়ী বাড়ছে না আয়। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব উপায়ে চামড়া প্রক্রিয়াজাত নিশ্চিত করতে সাভারের সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা জরুরি।
১০ বছর আগে প্রতি স্কয়ারফুট চামড়া বিক্রি হতো ১ ডলার ৫০ সেন্ট থেকে ১ ডলার ৭০ সেন্টে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক সনদ না থাকায় বাংলাদেশের চামড়ার দাম নেমে এসেছে প্রতি স্কয়ারফুট ৫০ থেকে ৭০ সেন্টে। অন্যদিকে, পোল্যান্ডের ট্যানারি প্রতিষ্ঠান এলসি কোম্পানি লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাওয়ার পর ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের ২৪৬টি প্রতিষ্ঠানের চামড়ার দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে। এসব দেশে এখন প্রতি স্কয়ারফুট চামড়ার দাম ১ দশমিক ৮০ থেকে ২ দশমিক ৫০ ডলার পর্যন্ত।
শুধু এলডব্লিউজি সনদ নয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্যানারিতে আধুনিক মজুত ব্যবস্থাও নেই। এ সুযোগে ভারত, চীন ও ভিয়েতনামের মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হচ্ছে। ফলে বৈশ্বিক ৪২০ বিলিয়ন ডলারের চামড়া বাজারে বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কাঁচা চামড়া সরবরাহ করলেও আর্থিক অংশীদারিত্ব মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ।
ট্যানারি মালিকরা বলছেন, সক্ষমতা থাকলেও আন্তর্জাতিক সনদ না থাকায় বাংলাদেশ প্রিমিয়াম মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ১০ বছর আগের সমপরিমাণ রফতানি করেও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কম পাচ্ছে দেশ।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) ভাইস চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, আগে দেশের চামড়া রিপ্রসেস হয়ে আমেরিকায় যেত। তখন প্রতি স্কয়ারফুট চামড়ার গড় দাম ছিল ১ ডলার ৬০ থেকে ১ ডলার ৮০ সেন্ট। কারণ তারা ভালো মানের চামড়া নিত। এখন যদি ২০ থেকে ২৫টি ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পায়, তাহলে সেই বাজার আবারও আমাদের জন্য উন্মুক্ত হবে।
গবেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপির অভাবেই আটকে আছে প্রায় ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলারের রফতানি সম্ভাবনা। অথচ আন্তর্জাতিক মান অর্জনে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এককালীন।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, সাভারের শিল্পনগরীতে সিইটিপি সমস্যার কারণেই বড় সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে। এটি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা গেলে বাংলাদেশের জন্য বিশাল বাজার উন্মুক্ত হবে। তখন প্রতিবছর চামড়া খাত থেকে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব। এতে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ লাগলেও একবার কাজ সম্পন্ন হলে দীর্ঘমেয়াদে শুধু পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় থাকবে, আর এর সুফল মিলবে দীর্ঘ সময়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সবচেয়ে বেশি মূল্য সংযোজন হয় এমন এই রফতানিমুখী খাতে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় খেলাপি ঋণের হারও বাড়ছে। তাই কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বহুমুখী রফতানির স্বার্থে চামড়া খাতকে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে নীতিগত বাধা দূর করা জরুরি।