
আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা উদযাপন করছে স্পেন। ছবি : এএফপি
অপেক্ষাটা ছিল ১৬ বছরের। ২০১০ সালের পর আর কখনো কোয়ার্টার ফাইনালেই খেলতে পারেনি স্পেন। লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে এবার স্বপ্ন দেখেছিল লা রোহারা। তবে টুর্নামেন্টের শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছিল তারা। সেই শোককেই যেন শক্তিতে রূপান্তর করল স্প্যানিশরা। যার পূর্ণতা এলো ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারানোর মাধ্যমে। নান্দনিক ফুটবল উপহার দিয়ে ১৬ বছরের অপেক্ষা ফুরিয়ে উঁচিয়ে ধরল বিশ্বকাপের দ্বিতীয় শিরোপা। অন্যদিকে, ইতিহাস গড়া হলো না আর্জেন্টিনার।
পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে আলো ঝলমলে পারফরম্যান্স করা আর্জেন্টিনা এদিন নিজেদের ছায়া হয়ে রইল। অবস্থাটা এমন যে, ১১৫ মিনিট পর্যন্ত স্পেনের গোলমুখে কোনো শটই নিতে পারেনি তারা। উল্টো লাল কার্ড হজম করে বাড়াল বিপদ। বিপরীতে, নিজেদের ঐতিহ্যগত পাসিং ফুটবলের পসরা সাজিয়ে বসল স্পেন। একের পর এক আক্রমণ করে পরীক্ষা নিল আলবিসেলেস্তেদের রক্ষণে। তবে টলাতে পারছিল না এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে। অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে ভাঙে প্রতিরোধ। বল জালে জড়ান ফেরান তোরেস।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শিরোপা নির্ধারণের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা আর স্পেন। ১২০ মিনিট শেষে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে শিরোপা জিতল স্পেন।
ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখলে রেখে আর্জেন্টিনার রক্ষণে ভীতি ছড়াতে থাকে স্পেন। ম্যাচের তৃতীয় মিনিটে টানা দুটি আক্রমণ করে তারা। ডানপ্রান্ত ধরে আক্রমণে উঠে আর্জেন্টিনার বক্সে ভীতি ছড়ায় স্প্যানিশরা। প্রথমবার বক্সের মধ্যে ঢুকে দারুণ একটি শট নিয়েছিলেন ইয়ামাল। সেটি আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে আটকে যায় এমিলিয়ানো মার্টিনেজের শরীরে। পরের আক্রমণ ব্লক হয় আর্জেন্টিনার রক্ষণে।
এরপর ম্যাচের চতুর্থ মিনিটে প্রতিআক্রমণ থেকে বিপদে পড়তে যাচ্ছিল স্পেন। বল নিয়ে বামপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠছিল আর্জেন্টিনা। প্রায় মধ্য মাঠে উঠে এসে সেই আক্রমণ রুখে দেন গোলরক্ষক উনাই সিমন।
ম্যাচের ১৮তম মিনিটে আবারও আক্রমণে উঠেছিল স্পেন। নিজেদের অর্ধ থেকে বাড়ানো বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে পড়েন লামিন ইয়ামাল। সঙ্গে থাকা ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ছয় গজ বক্সে ক্রসও বাড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বল সতীর্থকে খুজে নেওয়ার আগেই গ্লাভসবন্দি করেন মার্টিনেজ।
এরপর ম্যাচের গতি কিছুটা কমে যায়। দুই দলের মাঝমাঠে বল দখলের লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়। তবে আক্রমণ গড়তে পারেনি কোনো দলই।
ম্যাচের ৩৮তম মিনিটে আরেকবার আর্জেন্টিনাকে ভয় পাইয়ে দেয় স্পেন। বামপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে সুইচ করে ডানপ্রান্তে মিকেল ওইয়ারাসাবালের কাছে পাসে দেন। বক্সের বাইরে থেকে দারুণ একটি শট নিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই বল আটকাতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি মার্টিনেজকে।
এরপর ৪৩তম মিনিটে আবারও আর্জেন্টিনার গোলমুখে শট নিয়েছিল স্পেন। বক্সের বাইরে থেকে কোনাকুনি শট নিয়েছিলেন কুকুরেলা। মার্টিনেজকে ফাঁকি দিয়ে বল বেড়িয়ে গিয়েছিল ঠিকই। তবে সেটি লক্ষ্যে থাকেনি। বেড়িয়ে যায় গোলবারের পাশ দিয়ে।
শেষ পর্যন্ত কোনো দলই খুঁজে পায়নি জালের দেখা। ফলে গোলশূন্য সমতায় থেকেই বিরতিতে যায় দুই দল। বিরতি থেকে ফিরে দ্বিতীয় মিনিটেই আক্রমণ শাণায় স্পেন। আক্রমণে উঠে বক্সের বাইরে থেকে শট নিয়েছিলেন অ্যালেক্স বায়েনা। তবে দারুণ দক্ষতায় সেটি আটকে দেন গোলরক্ষক মার্টিনেজ।
এরপর ৫৬তম মিনিটে আবারও আর্জেন্টিনার রক্ষণে ভীতি ছড়ায় স্পেন। সে যাত্রায় ক্লিয়ার করে আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেন গঞ্জালো মন্তিয়েল।
৬৪তম মিনিটে প্রায় ভুল করে বসেছিলেন মার্টিনেজ। বামপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে ওঠে স্পেন। বল নিয়ে বক্সের বাইরে থেকে আচমকা শট নেন দানি ওলমো। সামনেই বাউন্স করা বল ঠিকঠাক গ্লাভসবন্দি করতে পারেননি মার্টিনেজ। কাছেই থাকা স্পেনের ফুটবলার সেই বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ছুটে যান। তবে বল তার আগেই গোললাইনের বাইরে চলে যায়।
পরের মিনিটে আবারও আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেন মার্টিনেজ। ডানপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে দুইজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোললাইন থেকে ছয় গজ বক্সের মধ্যে ক্রস বাড়ান ইয়ামাল। সেখান থেকে দারুণ হেড করেছিলেন বদলি নামা ফেররান তোরেস। দারুণ দক্ষতায় সেটি আটকে দেন মার্টিনেজ।
ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে টানা তিনটি আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণের পরীক্ষা নেয় স্পেন। প্রথম দফা বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া প্রেদির শট আটকে দেন মার্টিনেজ। সেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিতীয় আক্রমণ শাণায় লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। বক্সের ডানপ্রান্ত থেকে নেওয়া পাউ কুবার্সির শটও আটকে দেন মার্টিনেজ।
৮০তম মিনিটে নিশ্চিত গোল আটকে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে রাখেন মার্টিনেজ। গোললাইনের কাছে থেকে ছয় গজ বক্সের মধ্যে ক্রস বাড়ান নিকো উইলিয়ামস। লাফিয়ে উঠে দারুণ হেড করেছিলেন আইমেরিক লাপোর্তে। তবে তারচেয়েও ভালো ছিল মার্টিনেজের সেভ। দারুণভাবে বল গ্লাভসবন্দি করেন তিনি।
যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে প্রতিআক্রমণে উঠেছিল স্পেন। নিজেদের অর্ধ থেকে বাড়ানো নিয়ে বল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বক্সের ডানপ্রান্ত থেকে বুলেট গতির শট নিয়েছিলেন নিকো উইলিয়ামস। সেটি আটকে দিযে আর্জেন্টিনাকে রক্ষা করেন মার্টিনেজ।
এরপর যোগ করা সময়ে তৃতীয় মিনিটে পাউ কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখে মাঠ ছাড়েন এনজো ফার্নান্দেজ। অষ্টম মিনিটে বক্সের সামনে ফ্রি-কিক পেয়েছিল স্পেন। সেখান থেকে ইয়ামালের বাঁকানো ডান কোণা দিয়ে বল জড়াচ্ছিল জালে। তবে সেই বল আটকে দিয়ে স্পেনকে হতাশ করেন মার্টিনেজ।
দশজনের দল নিয়েও দারুণ লড়াই করে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। তবে বেশি সময় আর ধরে রাখতে পারেনি স্পেনকে। ১০৬তম মিনিটে প্রতিরোধ ভাঙেন ফেরান তোরেস। নিকো উইলিয়ামসের পাস থেকে দারুণ শটে বল পাঠান তোরেস।
শেষদিকে বেশ কয়েকটি আক্রমণ করে আর্জেন্টিনা। তবে কোনোভাবেই স্পেনের প্রতিরোধ ভাঙতে পারেনি তারা। রেফারি শেস বাঁশি বাজাতেই উল্লাসে মেতে ওঠে স্পেন শিবির। এ উল্লাস শিরোপা জয়েল উল্লাস।