
‘জাতিকে বিভক্ত করে কাউকে পেছনে নিতে দেওয়া হবে না’ উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা টাকা নিয়ে ভোট চাইতে আসবে তাদেরকে পুলিশে দেবেন।
আজ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সীতাকুণ্ড উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা মাঠে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জামায়াতের আমির আলাউদ্দিন শিকদারের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।
জামায়াত আমির বলেন, আজকের এই জনজোয়ার, এই জনস্রোত, এই জনপ্লাবন শুধু চট্টলায় নয়, টেকনাফ থেকে শুরু করে তেতুলিয়া, জাফলং থেকে সুন্দরবন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সারা বাংলাদেশ জেগে উঠেছে। বাংলাদেশ বলে দিয়েছে, আমরা আর ধান্দাবাজদের সঙ্গে নেই। যারা আধিপত্যবাদের গোলাম তাদের সঙ্গেও নেই। আমরা আজাদির বাংলাদেশের পক্ষে। ইনশাআল্লাহ জেগে ওঠা এই বাংলাদেশের আজাদি নিশ্চিত হবে, ইনশাআল্লাহ। আমরা সবক্ষেত্রে ন্যায়বিচার চাই। আমার পাওনা আমি চাই—তোমার পাওনা তুমি নাও, কিন্তু আমার পাওনা তুমি নিয়ে যাবে, এটা আর মানব না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার পরে এক এক করে ৫৪ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এই ৫৪ বছরে সরকার এসেছে, সরকার গেছে। সরকারের লোকদের কপালের পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু জনগণের পরিবর্তন হয়নি। হ্যাঁ, যদি বলি কিছুই হয়নি, এই কথাটা সত্য হবে না। তবে যা হওয়ার দরকার ছিল তা হয়নি। কেন হয়নি?
জামায়াত আমির আরও বলেন, যারা নির্বাচনের আগে বাজার থেকে নতুন নতুন দামি টুপি কেনে, তসবিহ আনে মক্কা শরিফ থেকে আর বের হয় ইলেকশনের ক্যাম্পেইনে। কারও বাড়িতে গিয়ে বলে—আপনার সঙ্গে পরে বসব আগে চাচার কবরটা জিয়ারত করে আসি। কয় কোন চাচার? কয় আপনার আব্বাজানের। কয় আস্তাগফিরুল্লাহ আমার আব্বা তো এখনও জীবিত আছে। বুঝছেন? মানুষকে খুশি করার জন্য জ্যান্ত বাপেরও কবর জিয়ারত করে। তারা আরও সুন্দর করে বলে, যার চেহারায় চোখ পড়ে তাকেই বলে ভাই আপনারে আমার ভাইয়ের মতো লাগে দেখতে। নির্বাচন যখন চলে যায় তখন পাশ থেকে দাঁড়াইয়া সালাম দিলে জবাব দেওয়ার সময় নেই। আগে ছিল ভাই এখন হয়ে গেছে অন্য কিছু। আমি আর এটা মুখে নিলাম না। বুঝতে পারছেন? এরা ধান্দাবাজ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এরা নির্বাচনের সময় টাকার বস্তা নিয়ে নামে। মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। যারা মানুষের ভোট—গরিব হোক, ধনী হোক; এই ভোট যারা অর্থের বিনিময়ে প্রভাবিত করতে চায়, তারা মানুষ নামের কলঙ্ক। এরা আসলে আপনাকে টাকা দিতে আসেনি, এরা আপনার ইজ্জত এবং আপনার বিবেক কিনতে এসেছে। আমি চট্টলার বীর জনগণের কাছে জানতে চাই, ওরকম যদি অবৈধ টাকা নিয়ে নির্বাচনের সময় আপনাদের কাছে কেউ ভোট চাইতে আসে, আপনারা কি তাদের ছেড়ে দেবেন? না, সবগুলোকে ধরে রেখে পুলিশে দেবেন। তবে নিজেরা আইন হাতে তুলে নেবেন না, পাহারাধারী করবেন।
জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আগে একটা স্লোগান ছিল—এই ধান্দাবাজদের আমার ভোট আমি দেব তোমারটাও আমি দেব। এখন এদিন শেষ। ৩৬ জুলাইয়ে কবর রচনা করে দিয়েছে। ৩৬ জুলাইয়ে এটা পায়ের নিচে আমরা ফেলে দিয়েছি। এখনকার জবাব স্পষ্ট, সাফ আমারটা আমি দেব তোমারটা তুমি দাও। আমার ভোটে হাত দিলে হাত ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। এ আমার শুধু অধিকার নয়, এ আমার আমার দায়িত্ব বটে। আমার দেশ আমি গড়ব। আমার দল আমি পছন্দ করব তুমি কে? পারবেন? শিউর পারবেন? নাকি কোনো চোখ রাঙানিকে ভয় করবেন? অবশ্যই না।
যুবক ও তরুণদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইয়ে যুবকরা যুবসমাজ, যুব-যুবতি, তরুণ-তরুণীরা রাস্তায় নেমে তোমরা কী স্লোগান দিয়েছিলে, আমাদের হাতে বেকার ভাতা দাও? তোমরা স্লোগান দিয়েছিলে, আমাদের হাতে মর্যাদার কাজ দাও। এটি আমার অধিকার। আমি কাজ করে দেশ গড়তে চাই। কারও কাছে বেকার ভাতা চাই না। আমরা কথা দিচ্ছি, আমরা বেকার ভাতার আশপাশেও যাব না। আমরা প্রত্যেকটা যুবক-যুবতি তরুণ-তরুণীর হাতকে দেশ গড়ার কারিগরের মজবুত হাতে পরিণত করব ইনশাআল্লাহ। তারপরে কাজ হাতে তুলে দিয়ে বলব—আগাও তুমিই বাংলাদেশ। হে যুবক, হে যুবতি, হে তরুণ, হে তরুণী—তোমরাই আমাদের বাংলাদেশ।
শফিকুর রহমান বলেন, আর পেছনের দিকে যাওয়ার সুযোগ নেই, সময় নেই। অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে এই জাতির। আর এই জাতিকে বিভক্ত করে কাউকে পেছনে নিতে দেওয়া হবে না। এখানে আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—চারটা ধর্মের মানুষ বসবাস করি। আমরা চারটি ধর্ম দিয়েই বাংলাদেশকে ফুলের বাগানের মতো সাজাব ইনশাআল্লাহ। আর ধর্মে বর্ণে কোনো বিভক্তি টানতে দেব না। এই দেশে সবাই মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করবে। কারও করুণার পাত্র হয়ে নয়, নিজের যোগ্যতা বলে, ইনশাআল্লাহ। যুবকরা তৈরি হয়ে যাও। আমাদের এই ছোটাছুটি দৌড়াদৌড়ি তোমাদের জন্যে। এই বাংলাদেশ তোমাদের হাতে তুলে দেব।
জামায়াত আমির বলেন, যুবকরা বাংলাদেশকে সঠিক পথে নিয়ে যাবা। যত চাঁদাবাজ, ধান্দাবাজ যারা মামলাবাজ, যারা দুর্নীতিবাজ, যারা স্ট্যান্ডবাজ। এদেরকে বলব, এগুলো ছেড়ে দেন। এগুলো খারাপ কাজ। এগুলো হারাম, এগুলো সাফ হারাম। সুপথে চলে আসেন, আপনাদেরকেও শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে আপনাদের হাতেও মর্যাদার কাজ তুলে দেব, ইনশাআল্লাহ। এইত সবাই মিলেই তো বাংলাদেশ। এজন্যেই আমাদের স্লোগান ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। আপনারা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের সঙ্গে আছেন? আলহামদুলিল্লাহ।
নারী ভোটারদের উদ্দেশে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, মায়েদেরকে আমাদের স্পষ্ট বার্তা, মায়েরা বড় ঋণী করে রেখেছেন আমাদেরকে। আমাদেরকে আপনাদের গর্ভে ধারণ করেছেন, বুকের দুধ দিয়েছেন, বুকের বিছানায় লালনপালন করেছেন। এই ঋণ জীবনেও পরিশোধ করতে পারব না। আমরা চাই, আপনাদেরকে আমাদের মাথার তাজ হিসেবে সম্মানের আসনে উঠাতে। যদি এটুকু পারি তাহলে কিঞ্চিত ঋণ পরিশোধ হবে, সবটুকু নয়।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আমরা চাই—আমাদের মায়েরা শিক্ষা ও যোগ্যতায় তারা এগিয়ে যাক। একজন মা শিক্ষিত হলে একটা পরিবার শিক্ষিত হয়, পরিবারগুলো শিক্ষিত হলে একটা সমাজ এবং জাতি শিক্ষিত হয়। মা হচ্ছেন শিক্ষার বুনিয়াদ এবং সমাজেরও বুনিয়াদ, সভ্যতারও বুনিয়াদ। আমাদের মায়েদেরকে নিয়ে কেউ কিছু উল্টাপাল্টা করছে, আমরা জানি সুড়সুড়ি দিচ্ছে। আমি এর প্রতিবাদ করি, গত পরশুদিন থেকে আমার পেছনে লেগে গেছে। জানেন তো আপনারা? যারা লেগেছে, ইনশাল্লাহ এটা তাদের গলার ফাঁস হয়ে তাদের গলায় ঝুলবে ইনশাল্লাহ। মানুষ বোঝে, সবকিছু বোঝে। নিজেই চালাক বাকিরা বোকা—এই দিন শেষ। এখন সবাই সবারটা বোঝে।