
দ্বিতীয় মেয়াদ অনেকটা আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য দিয়ে শুরু করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক মাসের অব্যাহত হুমকি ও চাপের পর গত শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে কারাকাসের সুরক্ষিত এক প্রাসাদ থেকে তুলে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাম্প ১৮২৩ সালের ‘মনরো ডকট্রিন’ বা পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্যের নীতিকে আবার সামনে এনেছেন। তিনি এটিকে নতুন করে ‘ডনরো ডকট্রিন’ নাম দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযানের আগে ও পরে ট্রাম্প আরও বেশ কয়েকটি দেশকে একাধিক হুমকি দিয়েছেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তিনি যেসব দেশকে হুমকি দিয়েছেন, সেসব নিয়ে কিছু আলোচনা তুলে ধরা হলো।
গ্রিনল্যান্ড
ডেনমার্কের স্বায়ত্ত্বশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। তবে ট্রাম্প পুরো দ্বীপটিই নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে চান।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের গ্রিনল্যান্ড দরকার।’ তার দাবি, এই দ্বীপটির ‘চারদিকে রুশ ও চীনা জাহাজে ভরে গেছে’।
ডেনমার্কের এই বিশাল আর্কটিক দ্বীপটি যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রায় ২ হাজার মাইল (৩,২০০ কিলোমিটার) দূরে অবস্থিত।
গ্রিনল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ বা ‘রেয়ার আর্থ’ রয়েছে, যা স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক যান এবং সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এসব বিরল খনিজ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন অনেক এগিয়ে।
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা আর্কটিক অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ দেয়।
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স ফ্রেডরিক নিলসেন দ্বীপটির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ধারণাকে একটি ‘কল্পনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আর কোনো চাপ নয়, আর কোনো ইঙ্গিত নয়, আর দখলদারিত্বের কল্পনা নয়। আমরা সংলাপের জন্য প্রস্তুত, আলোচনা করতে আগ্রহী। তবে তা অবশ্যই যথাযথ পথে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান রেখে হতে হবে।’
কলম্বিয়া
ভেনেজুয়েলায় অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পরই ট্রাম্প কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোকে উদ্দেশ করে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘তিনি যেন নিজের দিকে খেয়াল রাখেন।
ভেনেজুয়েলার পশ্চিমের প্রতিবেশী কলম্বিয়ায় রয়েছে উল্লেখযোগ্য তেল মজুত। দেশটি স্বর্ণ, রুপা, পান্না, প্লাটিনাম ও কয়লার বড় উৎপাদক হিসেবেও পরিচিত।
এ অঞ্চলটির মাদক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রও কলম্বিয়া—বিশেষ করে কোকেন উৎপাদন ও পাচারে দেশটির ভূমিকা বড়।
গত সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্যারিবিয়ান সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে নৌকায় হামলা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করে, এসব নৌকা মাদক বহন করছিল। এ ঘটনার পর থেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে দেশটির বামপন্থি প্রেসিডেন্টের বিরোধ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করেছে।
অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট পেত্রোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, তিনি মাদক কার্টেলগুলোকে ‘বিকশিত হতে দিচ্ছেন’।
রোববার (৪ জানুয়ারি) এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘কলম্বিয়া এবং ভেনেজুয়েলা দুটো দেশই গভীর সংকটে আছে। কলম্বিয়ায় একজন অসুস্থ ব্যক্তি দেশ চালাচ্ছেন, যিনি কোকেন তৈরি করে তা যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি করতে পছন্দ করেন। আমি আপনাকে বলতে চাই, তিনি খুব বেশি দিন এমনটা চালিয়ে যেতে পারবেন না।’
ইরান
বর্তমানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল ইরান। ১ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন,‘শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের যদি ইরান গুলি করে ও সহিংসভাবে হত্যা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসতে প্রস্তুত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত, যেকোনো সময় ইরানে পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে।’এ প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প রাতারাতি সতর্ক করে বলেছেন, সেখানে যদি আরও বিক্ষোভকারী নিহত হয়, তবে কর্তৃপক্ষকে “খুব কঠোরভাবে আঘাত” করা হবে।
এছাড়া রোববার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানে যা ঘটছে তা ‘খুব কাছ থেকে’ পর্যবেক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র। আগের মতো যদি তারা মানুষ হত্যা শুরু করে, তাহলে যুক্তরাষ্টের পক্ষ থেকে দেশটিতে শক্তিশালী আঘাত আসবে বলে আমি মনে করি।’
যদিও ইরান ‘ডনরো ডকট্রিন’-এ নির্ধারিত ভৌগোলিক সীমার বাইরে পড়ে। তবুও গত বছর দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পর ট্রাম্প ইরানি সরকারের বিরুদ্ধে আরও পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়েছেন।
গত সপ্তাহে ফ্লোরিডায় ট্রাম্প ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকে ইরানে নতুন করে হামলার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, নেতানিয়াহু ২০২৬ সালে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলার সম্ভাবনার কথাও তুলেছেন।
মেক্সিকো
২০১৬ সালে ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার মূল কারণ ছিল মেক্সিকোর দক্ষিণ সীমান্তে ‘দেয়ালৈ তৈরির’ ঘোষণা দিয়ে। ২০২৫ সালে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম দিনই তিনি মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘আমেরিকা উপসাগর’ রাখার একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন।
তিনি প্রায়ই দাবি করেন যে, মেক্সিকান কর্তৃপক্ষ মাদক বা অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ বন্ধে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ট্রাম্প মনে করেন, মেক্সিকো মাদক ও অবৈধ অভিবাসীদের ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। তিনি বলেছেন, মেক্সিকোর মাদক কারবারিরা অনেক শক্তিশালী এবং তাদের বিরুদ্ধে কিছু একটা করতেই হবে।
তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেনবাউম স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, মেক্সিকোর মাটিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না।
কিউবা
ফ্লোরিডা থেকে মাত্র ৯০ মাইল (১৪৫ কিমি) দক্ষিণে অবস্থিত এই দ্বীপরাষ্ট্রটি ১৯৬০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। নিকোলাস মাদুরোর ভেনেজুয়েলার সাথে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
রোববার এয়ার ফোর্স ওয়ানে কিউবার প্রসঙ্গ টেনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, দেশটিতে ‘সামরিক হস্তক্ষেপের’ সম্ভাবনা কম। কারণ, তারা নিজেরাই পতনের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘কিউবা পতনের মুখে। আমি আসলে জানি না, তারা কীভাবে ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু কিউবার এখন কোনো আয় নেই। তারা তাদের সব আয় ভেনেজুয়েলা থেকে ও ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল থেকে পেয়েছে।’
ভেনেজুয়েলা কিউবার প্রায় ৩০ শতাংশ তেল সরবরাহ করে বলে জানা গেছে। মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুতির পর কিউবার জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনীতি ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কিউবান বংশোদ্ভূত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার সাংবাদিকদের বলেছেন, আমি যদি হাভানায় থাকতাম এবং সরকারে থাকতাম, তাহলে আমি চিন্তিত হতাম- অন্তত কিছুটা হলেও।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট (ট্রাম্প) যখন কিছু বলেন, তখন সেটাকে গুরুত্ব সহকারে নেয়া উচিত।’ সূত্র: বিবিসি