
মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করা এবং বৈশ্বিক তেলের বাজারকে বিপর্যস্ত করা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে খবর দিচ্ছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, একটি চুক্তির অধিকাংশ বিষয়েই চূড়ান্ত আলোচনা হয়েছে এবং এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকছে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, বিশ্ববাসী শিগগিরই ‘কিছু ভালো খবর’ পেতে পারে।
তবে ট্রাম্পের এই ঘোষণার আগে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ওয়াশিংটনের সঙ্গে এক ধরনের ‘সমঝোতার প্রবণতা’ লক্ষ্য করার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। তিনি অবশ্য একথা বললেও সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘এর মানে এই নয় যে আমরা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে একটি চুক্তিতে পৌঁছে যাব।’
বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর আগে ইরানের উদ্দেশ্য ছিল প্রথমে একটি সমঝোতা স্মারক বা এক ধরনের ‘রূপরেখা চুক্তি’ তৈরি করা, যাতে আগামী ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তি করা যায়।
সম্ভাব্য এই চুক্তি সম্পর্কে বার্তা সংস্থা এএফপির কাছে থাকা কিছু তথ্য এনটিভির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
পারমাণবিক ইস্যু
ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, পারমাণবিক বিষয়টি প্রাথমিক রূপরেখার অংশ নয় এবং এটি পরবর্তী পর্যায়ে পৃথক আলোচনার বিষয় হবে।
তবে নিউ ইয়র্ক টাইমস নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তির একটি অন্যতম প্রধান উপাদান হলো উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ত্যাগ করার বিষয়ে তেহরানের একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার।
পত্রিকাটির মতে, ইরান কীভাবে এটি করবে তা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী দফার আলোচনায় আলোচিত হবে।
কিন্তু ইরানের ফার্স এবং তাসনিম নিউজ এজেন্সি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে, ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে কোনো অঙ্গীকার করেনি।
ফার্স নিউজ জানিয়েছে, ইরান এই চুক্তিতে পারমাণবিক মজুত হস্তান্তর, সরঞ্জাম অপসারণ, স্থাপনা বন্ধ বা এমনকি পারমাণবিক বোমা তৈরি না করার বিষয়েও কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।
উভয় বার্তা সংস্থাই জানিয়েছে যে, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে পারমাণবিক সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে।
হরমুজ প্রণালি কীভাবে পুনরায় খুলে দেওয়া হবে?
আলোচনার প্রধান জটিল বিষয় হলো তেল পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করা, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইরান জোর দিয়ে বলে আসছে, জাহাজগুলোকে অবশ্যই তাদের সশস্ত্র বাহিনীর কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, চুক্তির অন্যান্য অনেক ধারার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্বস্তি এনে দেবে।
তবে ফার্স নিউজ এজেন্সি বলেছে, চূড়ান্ত হলে এই সম্ভাব্য চুক্তিটি কৌশলগত জলপথের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।
তাসনিম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না। সংবাদ সংস্থাটি আরও যোগ করেছে, ইরানের বন্দরগুলোর উপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ ৩০ দিনের মধ্যে পুরোপুরি তুলে নিতে হবে।
ইরানের আটকে থাকা তহবিল ও নিষেধাজ্ঞা
দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা নিজেদের অবরুদ্ধ অর্থ বা সম্পদ মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে ইরান।
তাসনিম সংবাদ সংস্থার মতে, ইরান জোর দিয়ে বলেছে যেকোনো প্রাথমিক সমঝোতার শর্ত হিসেবে অন্তত আংশিকভাবে হলেও এই সম্পদগুলোতে ইরানের অধিকার থাকতে হবে।
সংবাদ সংস্থাটি একটি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছে, ইরান জোর দিয়ে বলেছে, প্রথম পর্যায়ে ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ মুক্ত না করা পর্যন্ত কোনো চুক্তি হবে না। এছাড়া, সমস্ত অবরুদ্ধ তহবিল ক্রমাগত মুক্তির গ্যারান্টি দেওয়ার জন্য একটি স্পষ্ট প্রক্রিয়াও প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তাসনিমের সূত্রটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে যে, এই বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধই এখনও পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারার অন্যতম কারণ।
ফার্স নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য সমঝোতায় আলোচনা চলাকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল, গ্যাস এবং পেট্রোকেমিক্যালসের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে।
লেবানন ইস্যু কি এর অন্তর্ভুক্ত?
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও ইসরায়েল লেবাননে প্রতিদিন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং তারা বলছে যে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হচ্ছে।
ইরান এর আগে বলেছিল, যেকোনো যুদ্ধবিরতি অবশ্যই লেবাননসহ আঞ্চলিক যুদ্ধের সমস্ত ফ্রন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে হবে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ জানিয়েছে যে, তারা আত্মবিশ্বাসী যে তাদের মিত্র তাদের ছেড়ে যাবে না।
তাসনিম জানিয়েছে, প্রথমে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ঘোষণা করা হবে, যা লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে লড়াই বন্ধের ওপর জোর দেবে।
তাসনিমের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থার অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে ইসরায়েলও লেবাননে যুদ্ধ বন্ধ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, ‘এই পর্যায়ে আমরা পারমাণবিক বিষয়ের বিশদ বিবরণ নিয়ে আলোচনা করব না... আমরা আমাদের সবার জন্য একটি জরুরি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তা হলো লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান ঘটানো।’