
অতিরিক্ত ঠাসা শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকের তীব্র সংকট এবং জরাজীর্ণ ভবনের প্রতিবাদে ফরাসি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আজ আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। দেশটির বিভিন্ন শহরে স্কুলের সামনে শিক্ষার্থীদের অগ্নিসংযোগ ও রাস্তা অবরোধের মতো ঘটনা আরও বেড়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ১৬০টিরও বেশি স্কুল পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছিল, আর অন্যদিকে প্যারিস ও মার্সেইয়ের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ারাও এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে। ফরাসি উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার (১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের 'লিসে') এই আন্দোলনে ইতোমধ্যে কয়েকশ’ শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ফরাসি সরকার জানিয়েছে, বিক্ষোভগুলো এখন ‘নগর সহিংসতায়’ রূপ নিয়েছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লোকোর্নু বৃহস্পতিবার সব মন্ত্রীকে দেশব্যাপী যেকোনো ধরনের সফর স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
চলতি বছরের তাপদাহের সময় প্রচণ্ড উত্তপ্ত শ্রেণিকক্ষ, সময়সূচি বা রুটিনের বিভ্রাট, ক্লাসে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকের ঘাটতিসহ নানা ক্ষোভ থেকে গত সপ্তাহ হতে শিক্ষার্থীরা স্কুলের বাইরে এই বিক্ষোভ শুরু করে।
প্যারিসের উপশহরগুলো থেকে এই আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সরকার এই অস্থিরতায় উসকানি দেওয়ার জন্য উগ্র-বামপন্থি রাজনীতিকদের ওপর দায় চাপিয়েছে।î
শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হতে দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা ok হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজের মতে, তিনজন শিক্ষার্থীর ওপর পুলিশি বর্বরতার অভিযোগ ওঠার পর বাহিনীর অভ্যন্তরে তদন্ত শুরু করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, সকালের মাঝামাঝি সময়ে হাইস্কুলগুলোর সামনে প্রায় ৩৪০টি প্রতিবাদ কর্মসূচি চলছিল, যার ফলে ১৬০টিরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
একটি ছাত্র ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে প্যারিস ও দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মার্সেইসহ প্রায় ৩০টি ক্যাম্পাসের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে দেয়।
উত্তরাঞ্চলীয় শহর কায়েনের ১৬ বছর বয়সী মালে জানায়, যারা ডাস্টবিনে আগুন দিচ্ছে তারা যেন আগুন না জ্বালিয়ে ‘কথার মাধ্যমে’ তাদের প্রতিবাদ প্রকাশ করে। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সরকার স্কুলে স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিষয়টি টেনে সে বলে, ‘আমরা অতিরিক্ত ঠাসা ক্লাসরুমের বিরুদ্ধে এবং এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি, যারা ফোন রাখা প্রতিরোধী পাউচের পেছনে লাখ লাখ ইউরো খরচ করে কিন্তু হিটিং ব্যবস্থা, এয়ার কন্ডিশনার কিংবা আমাদের শিক্ষকদের বেতনের পেছনে বিনিয়োগ করে না।’
বাজেট শূন্য
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর নানতেস আঞ্চলিক শিক্ষা বোর্ড জানিয়েছে যে, তাদের কর্মীদের ওপর সহিংস হয়ে ওঠা একটি সমাবেশের পর একটি হাইস্কুলের সামনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ মূলত নানতেসের বিভিন্ন হাইস্কুলের সামনে সহিংসতার কথা জানিয়েছে এবং এজন্য ‘সহিংস চক্রের’ ওপর দায় চাপিয়েছে। তাদের কথা অনুযায়ী ওই চক্রটি ভাঙচুর চালানোর জন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর স্ট্রাসবুর্গে দাঙ্গাকারী ও বিক্ষোভকারীদের চলাচল সীমিত করতে ট্রাম চলাচল বন্ধ করার নির্দেশ দেন আঞ্চলিক প্রধান কর্মকর্তা।
রাফায়েল নামের ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী স্ট্রাসবুর্গের একটি স্কুলের বাইরের বিক্ষোভকারীদের সাথে ছিল, যেখানে অনেকেই কাছে থাকা ট্রামওয়ে ট্র্যাকে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে নিরাপত্তা ব্যারিকেড ব্যবহার করে।
রাফায়েল বলে, ‘আমাদের প্রতি ক্লাসে ৩৫ জন করে শিক্ষার্থী বসতে হয়। গ্রীষ্মে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় যা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পর্যাপ্ত শৌচাগার নেই এবং কিছু কক্ষে ছাদ থেকে পানি পড়ে।’ সে আরও বলে, ‘ভবনটি ভেঙে পড়ছে, ক্যাফেটেরিয়া বা খাবার ঘরটি খুবই ছোট। কোনো বাজেট নেই, কোনো সম্পদ নেই, আবার পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক বা পরিদর্শকও নেই।’
কাছাকাছি জায়গায়, শিক্ষার্থীরা ট্রাম স্টপ থেকে তাদের স্কুলের উপড়ে ফেলা নামের সাইনবোর্ডটি হাতে ধরে জ্বলন্ত ডাস্টবিনের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল। তবে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই এসব ভাঙচুরে অংশ নেয়নি; বরং পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়লে তারা প্রধান সড়ক ধরে দৌড়ে সরে যায়।
সংবাদ সংস্থা এএফপি-র সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, দক্ষিণাঞ্চলের শহর তুলুজে শত শত তরুণ ট্রাম ট্র্যাকে নেমে পড়ে, যাদের মধ্যে কেউ কেউ ময়লার কন্টেইনার উল্টে আগুন ধরিয়ে দেয়, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বাস স্টপ ভাঙচুর করে।
সহিংসতাহীন সংগ্রাম
উত্তরাঞ্চলীয় লিলে শহরে কালো হুডি পরা একদল তরুণকে একটি বাস স্টপের কাচ ভেঙে ফেলতে দেখেন এএফপি-র সাংবাদিকরা। উল্টে দেওয়া আগুনে জ্বলা ডাস্টবিন নেভাতে সেখানেও ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের হস্তক্ষেপ করতে হয়।
সরকার উগ্র-বামপন্থী দল 'ফ্রান্স আনবাউড' (এলএফআই)-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগ এনেছে।
তবে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এলএফআই-এর প্রার্থী জ্যাঁ-লুক মেলেনশঁ বুধবার বলেন, তার দল সহিংসতাহীন সংগ্রামের পদ্ধতির জন্য আহ্বান জানিয়েছিল।
প্যারিসের বৃহত্তম উপশহর সেন্ট-দেনিস-এর এলএফআই দলীয় মেয়র বালি বাগায়োকো জানান, শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নেওয়া তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। চলতি সপ্তাহে সেন্ট-দেনিসের একটি হাইস্কুলের বাইরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দেখা করা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে নিজেকে সমর্থন করে তিনি বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে এটা উপযুক্ত স্থান।’
সেন্ট-দেনিসের মেয়র বিশেষ করে সোম ও মঙ্গলবার তার শহরের পল এলুয়ার্ড হাইস্কুল পরিদর্শনে যান। সেখানে অবরোধ চলাকালে প্রধান ফটকের একটি অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছিল।
এদিকে পার্শ্ববর্তী দেশ বেলজিয়ামেও পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়েজের কয়েকটি স্কুলে বিক্ষোভ ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।