
মিয়ানমারে নারী বন্দিরা ব্যাপক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং চিকিৎসায় মৃত্যু-ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে এমন অবহেলার শিকার হচ্ছে। নিউইয়র্ক-ভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরডাব্লিউ বুধবার (২৪ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এমন অভিযোগ তুলেছে৷
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী৷ তারপর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ চলছে৷ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান এ গৃহযুদ্ধের কারণে দেশটির বেশ কিছু অঞ্চল এখন প্রায় ধ্বংসস্তূপ৷ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৩৫ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এই গৃহযুদ্ধের কারণে৷
এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডাব্লিউ) জানিয়েছে, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষকে রাজনৈতিক কারণে আটক করা হয়েছে৷ রাজনৈতিক বন্দিদের মধ্যে নোবেলজয়ী সাবেক নেত্রী অং সান সু চি-সহ ছয় হাজার ৬০০ জনেরও বেশি নারী বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়৷ আরও বলা হয়, সেই ছয় হাজার ৬০০ জনের মধ্যে ৬৪০ জন শিশু৷
এইচআরডাব্লিউর এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক ব্রায়োনি লাউ জানান, ‘‘মিয়ানমারে রাজনৈতিক বন্দি হিসেবে আটক নারীরা সেখানকার কারাগার ব্যবস্থার খুব উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছেন৷ বন্দিদের ভোগান্তি ও অবহেলা সেখানে ইচ্ছাকৃত এবং নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা৷”
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটি জানিয়েছে, মিয়ানমারে কারা কর্তৃপক্ষ কিছু বন্দিকে লাঠি, শিকল, ধাতব পাইপ ও গুলতি দিয়ে মারধর করেছে৷ অনেক ক্ষেত্রে বন্দিদের বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া, দীর্ঘ সময় ধরে কষ্টদায়ক ভঙ্গিতে আটকে রাখা এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বলেও এইচআরডাব্লিউর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে৷
১৭ জন সাবেক নারী বন্দিরসাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে এইচআরডাব্লিউ৷ ১৭ জনের মধ্যে আন্দোলনকারী, সাংবাদিক, ত্রাণ ও স্বাস্থ্যকর্মী, তাদের পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীসহ নানা শ্রেণি, পেশার মানুষ ছিলেন৷ ২০২৫ ও ২০২৬ সালে তাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয় বলে জানিয়েছে এইচআরডাব্লিউ৷
মানবাধিকার সংস্থাটি বলছে, সাবেক বন্দিরা জানিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনের একাধিক ধারায় মামলা করা হয়েছিল৷ যেসব আইনে মামলাগুলো করা হয়েছিল তার মধ্যে অভ্যুত্থানের পরে কার্যকর হওয়া এমন একটি আইনও ছিল যা দিয়ে বিরোধী মত ও ভিন্নমত দমন করা হতো৷ এছাড়া সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী কঠোর ও ব্যাপক পরিসরের একটি আইনেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা৷
এই অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, এইচআরডাব্লিউর দেয়া তথ্যগুলোর সঙ্গে জাতিসংঘের তদন্তকারীদের ২০২৫ সালে দেয়া একটি প্রতিবেদনের মিল রয়েছে৷
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনেও মিয়ানমারের বন্দিশালাগুলোতে নির্যাতনের ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছিল৷ ‘‘মারধর, বৈদ্যুতিক শক, শ্বাসরোধের চেষ্টা, দলবদ্ধ ধর্ষণ, যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দেওয়া এবং অন্য ধরনের যৌন নির্যাতনের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল সেখানে৷
সাক্ষাৎকারে সাবেক বন্দিরা এইচআরডাব্লিউকে জানিয়েছেন, গুরুতর দীর্ঘস্থায়ী ও তীব্র অসুস্থতা সত্ত্বেও কারা কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেয় না৷ এমনকি গর্ভবতী নারীদেরও এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং কোনো কোনো নারীকে কারাগারের সেলের ভেতরেই সন্তান প্রসব করতে হয় বলেও জানিয়েছেন তারা৷
হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে সাবেক এক বন্দি বলেছেন, ‘‘সেখানে কোনো আল্ট্রাসাউন্ডের ব্যবস্থা ছিল না৷ তাই সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ জানার কোনো উপায় ছিল না৷ কারাবন্দি থাকার সময়ে মাঝরাতে আমার প্রসববেদনা শুরু হয়েছিল৷ এক পর্যায়ে পানি ভেঙে গিয়েছিল৷ অথচ আমাকে হাসপাতালে পাঠানোর চিঠিটি এসেছিল পরেরদিন সকাল ১০টায়৷ সন্তান প্রসবের পরপরই আমার পায়ে আবার শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়েছিল৷”