
Mostafa Kamal Majumder
মোস্তফা কামাল মজুমদার
আমার কাছে ঘনিষ্ট যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগত এক ভাই গতকাল আমাকে বললেন, আপনারা সংবাদ মাধ্যমে দৃশ্যমান ত্রুটি বিচ্যুতি নিয়ে লেখেননা কেন? আপনারা কি ভয় পান? কোন অফার আসতে পারে, যা মিস হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে? তিনি ডিভি লটারিতে সেদেশে গিয়ে নাগরিত্ব পেয়েছেন। দেশের জন্য অনেক ভালবাসা। সেখানে তিনি একটা দেশপ্রেমিক বাংলা পত্রিকার সম্পাদক। অনেক লেখালেখি করেন। বিশেষ করে কৌশলগত বিষয় ও দেশের রাজনীতি নিয়ে। বিগত ১৭ বছরে বিদেশে থেকেও আমাদের মত অনেক সাবধানে চলাফেরা করেছেন। বাংলাদেশ থেকে সেখানে যাওয়া এক এজেন্ট তার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করে তাকে ভীতিকর অবস্থায় ফেলে। তাকে দেশে আসতে বলে। দেশের সেই দূর্দিনে প্রানের ভয়ে এদিকে পা বাড়াবার সাহস করেননি। আমি তাকে যুক্তরাষ্ট্র যাবার পর সংবাদ মাধ্যমের কর্মি হিসেবে পরিচিতি লাভ ও সেখানকার প্রেস ক্লাবে সদস্যপদ পেতে সহায়তা করার জন্য আমার অনলাইন গ্রীনওয়াচ পোর্টালের আবাসিক প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে প্যাডে প্রশংসা পত্র পাঠিয়েছিলাম। যা কাজে লাগে। আমরা পরষ্পরকে বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করি।
নবনিযুক্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী গতকাল ১৮ ফেব্রুয়ারী বুধবার তাদের কর্মস্থল বাংলাদেশ সচিবালয়ে যাবার আগে প্রেস ক্লাব হয়ে যান। সেখানে প্রেস ক্লাব ও সংবাদিক ইউনিয়নের উপস্থিত নেতৃবৃন্দের সাথে তারা মত বিনিময় করেন এবং তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা কামনা করেন, বলে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে জানিয়েছেন দু’জন নেতা। বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের শাইরুল খানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তথ্য মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী এমন সৌজন্য দেখালেন যা অতীতে একই মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য কোন মন্ত্রী দেখিয়েছেন বলে মনে পড়ে না। সাংবাদিক সমাজ তাদের এ ঔদার্য অবশ্যই মনে রাখবে। মন্ত্রীত্ব পাবার আগে জহির উদ্দিন স্বপন বহুবার প্রেস ক্লাবে এসেছেন। তার একটা রাজনৈতিক পরিচিতি রয়েছে। বিএনপি মিডিয়া সেলের সাবেক আহবায়ক জহির উদ্দিন স্বপন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসনে জয়ী হয়েছেন। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকদের অবস্থার পরিবর্তন না করে গণমাধ্যমের অবস্থার পরিবর্তন করা যাবেনা। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য বিএনপির ৩১-দফা রূপরেখার ভিত্তিতে তিনি একটা পরিকল্পনা প্রনয়নের কথা বলেন। সম্প্রতি প্রনীত মিডিয়া কমিশনের রিপোর্টও তাদের হাতে আছে বলে তিনি জানান।
রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপির ৩১ দফা রূপরেখার ১১ দফায় বলা হয়েছে - গণমাধ্যমের পুর্নস্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধান ও সার্বিক সংস্কারের লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি, মিডিয়া সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীএবং বিজ্ঞ, অভিজ্ঞ ও গ্রহণযোগ্য মিডিয়া ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন করা হবে। সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এই লক্ষ্যে সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯ এর প্রয়োজনীয় সংশোধনসহ মৌলিক মানবাধিকার হরণকারী সকল কালাকানুন বাতিল করা হবে। চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি হত্যাসহ সকল সাংবাদিক নির্যাতন ও হত্যার বিচার নিশ্চিত করা হবে। ১৪ জুন ২০২৩ সালে এক সংবাদ সম্মেলনে এ রূপরেখা ঘোষণা করেন পার্টি মহাসচিব মির্জা ফখ্রুল ইসলাম আলমগীর। ২০২২ সালে ঘোষিত বিএনপির ২৭ দফা রূপরেখা তার রাজনৈতিক জোট সহযোগিদের সাথে পরামর্শক্রমে ৩১ দফায় উন্নিত করা হয়। তথ্য মন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যে মনে হল নতুন করে মিডিয়া কমিশন গঠন করার তাগিদ এখন আর নেই। দরকার একটা পরিকল্পনার।
আমরা নবনিযুক্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রিকে সাধুবাদ জানাই। সাথে সাথে বলতে চাই সাংবাদিকদের অবস্থার পরিবর্তিন করতে হলে গণমাধ্যমের কাঠামোগত পরিবর্তন আনয়ন করতে করতে হবে। কারণ সরাসরি তাদের অবস্থার পরিবর্তন করার কোন ব্যবস্থা বা সুযোগ নেই। সাংবাদিক কল্যান ট্রাষ্টের মত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুধুমাত্র দুস্থ বা সক্ষমতাহীন প্রবীন সাংবাদিকদের সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে। সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশ পুনরুদ্ধার করার জন্য দরকার পেশাদার সাংবাদিকদের পেশাগত নিয়ন্ত্রনে পরিচালিত সংবাদ মাধ্যম। বিগত প্রায় দুই দশকে গড়ে ওঠা গণমাধ্যম সংস্কৃতিতে এখন, হাতেগোনা কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ব্যতিরেকে, গ্ণমাধ্যমের পেশাগত নিয়ন্ত্রন সাংবাদিকদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এর কারণ বহুবিধ। যোগ্যতা বিবেচনা না করে যত্রযত্র পত্রিকার ডিকলারেশন ও মিডিয়ার রেজিষ্ট্রেশন প্রদান, সৎ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের উন্নয়নের পরিবর্তে দলীয় এবং ক্ষমতা রক্ষার স্বার্থে তা নিয়ন্ত্রনের ধারাবাহিক পদক্ষেপ, পেশাদারী সংবাদ মাধ্যমের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ বিনষ্ট, আর্থিক অস্বচ্চলতার সুযোগ নিয়ে সাংবাদিকদের চাকুরির বিনিময়ে অপেশাদারি কাজ করতে বাধ্য করা, অপেশাদার ও তোয়াজকারি সাংবাদিক নামধারিদের পৃষ্ঠপোশকতা ও ক্ষমতায়ন। এমনকি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও কাল টাকার যাথেচ্ছ ব্যবহার করে এমন অপেশাদার ও তোয়াজকারিদের সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে বসানো তার মধ্যে অন্যতম।
মননীয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, এসব কয়েক দশকের সৃষ্ট জঞ্জাল থেকে মুক্ত করে গণমাধ্যমকে অবাধ তথ্য প্রবাহের বাহনে পরিনত করা একটা মস্তবড় কঠিন কাজ। সদ্য পুনপ্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রকে সুসঙ্গহত ও দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে তার সঠিক নজরদারির (ওয়াচডগ ফাংশন) জন্য সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতা ফিরিয়ে আনার কোন বিকল্প নেই। এজ্ন্য প্রথমেই বলেছি, গণমাধ্যমের কাঠামোগত পরিবর্তন সাধন করতে হবে। গণমাধ্যমে পেশাগত নিয়ন্ত্রন ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজনে অবসরে যাওয়া প্রথিতযশা সাংবাদিকদের কাজে লাগানো দরকার। সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকদের সমর্থন দেয়ার জন্য তাদের অর্থনৈতিক অস্বচ্চলতা দূরিভূত করে পেশাদারী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। রাষ্ট্রের চতূর্থ স্তম্ভের উন্নতি বিধানের জন্য সরকারি কোষাগার থেকে যতসামান্ন বিনিয়োগও করতে হবে। যেন সাংবাদিকের সৎ ও স্বাধীন নজরদারির কাজ আর্থিক অস্বচ্চলতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা বিপদ্গ্রস্ত না হয়। এ প্রসঙ্গে বলতে চাই, সাংবাদিকতার মান উন্নয়নের জন্য প্রেস ইন্সষ্টিটিউট (পিআইবি) ও নিমকোতে পেশাগত বেসিক ও উন্নততর ট্রেনিংএর পাশাপাশি এই মান সমুন্নত রাখার স্বার্থে প্রেস কাউন্সিলকে আরো কার্যকর করতে হবে।
সাথে সাথে দল, নেতৃত্ব বা সরকারের সাথে সংশ্লিষ্টতার অজুহাতে কাউকে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকতার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার সাথে সামঞ্জস্যহীন পদে আসীন করার রেওয়াজ বাতল করতে হবে। কারণ, এ রেওয়াজ মেরিট-ভিত্তিক নিয়োগের সাথে সাংঘর্ষিক। সাথে সাথে তা সৎ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার উন্নয়ন ও বিস্তারে প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। এমন ভাবে নিয়োগ প্রাপ্ত ব্যক্তিরা তাদের নিজেদের নিয়োগকর্তাদের চেয়ে বেশী ক্ষমতাবান হিসেবে আচরণ করে এবং প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ব্যাহত করে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। নিশ্চই সংশ্লিষ্টরা তা অবগত আছেন। আমি নবনিযুক্ত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীর সর্বাংগীন সাফল্য কামনা করি।
(সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, প্রশিক্ষক ও উন্নয়ন প্রবক্তা, ডেইলী নিউ নেশনের সাবেক সম্পাদক মোস্তফা কামাল মজুমদার এখন গ্রীনওয়াচ ঢাকা পত্রিকা সম্পাদনা করছেন।)