
১৯৪৭ সালে “অখণ্ড বাংলা” (United Bengal) মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন বাংলা প্রদেশের
মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শরৎ বোস এবং পণ্ডিত আবুল হাশিম। তাঁরা বাংলা প্রদেশকে
বাঙালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র করতে চেয়েছিলেন। মুসলিম লীগ সভাপতি
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অখণ্ড স্বাধীন বাংলা প্রস্তাবের বিরোধিতা করেননি বরং সমর্থন করেছিলেন।
কিন্তু কট্টর ব্রাহ্মণ্যবাদী কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ ও হিন্দু মহাসভার শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীদের প্রবল
বিরোধিতায় অখণ্ড বাংলা প্রস্তাব আঁতুড় ঘরেই মারা যায়; বাঙালী জাতীয়তাবাদও দ্বিখণ্ডিত হয়ে
পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক সম্পত্তি হয়ে যায়, পূর্ব বাংলা তথা পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের ভাগে
পড়ে মুসলিম জাতীয়তাবাদ। ১৯৫২কে পুঁজি করে ১৯৫৫ পরবর্তী সময় থেকেই আওয়ামী লীগ
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে বাঙালী জাতীয়তাবাদকে (১৯৪৭ থেকেই যা ভারতীয় পশ্চিম বাংলার রাজনৈতিক
উপকরণ) রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে শক্তিশালী করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে অদ্যাবধি;
প্রতিবেশী ভারত করেছে পৃষ্ঠপোষকতা।
এজন্য তারা ভিন্নমত দমন, পীড়ন, মামলা, হামলা, গুম, খুন, আয়নাঘর, জুডিশিয়াল কিলিং, গণতন্ত্র
হত্যা করে বাকশাল- ফ্যাসিবাদ-মাফিয়াতন্ত্র কায়েম, ভোটাধিকার ও বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া, বিচার
বহির্ভূত হত্যা, গণহত্যা -এককথায় নেতিবাচক কিছু করা আর বাকী রাখেনি। আজ তারা নিজেরাই
গণহত্যার দায় মাথায় নিয়ে সদলবলে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। হালে পশ্চিম বাংলায় বিজেপির
ক্ষমতারোহনের মাধ্যমে অন্যান্য বিজেপি শাসিত অঞ্চলের মত পশ্চিম বাংলার মুসলমানরাও চরম
নিরাপত্তা হীনতা, বৈষম্যমূলক আচরণ ও নিপীড়নের শিকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সম্প্রতি
তারা আবারও সমগ্র ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে অসহায় ভারতীয় মুসলমানদের সীমান্ত এলাকায়
প্রতিনিয়ত জড়ো করছে এবং বাংলাদেশে পুশইন করার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে, যদিও বাংলাদেশ
সরকারের দৃঢ়তা ও সীমান্ত প্রহরী বিজিবির তৎপরতায় তারা সফল হতে পারছে না। দ্বি-জাতী তত্ত্ব ও
মুসলিম জাতীয়তাবাদ, ৪৭ এর আজাদি তথা আমাদের বুনিয়াদী স্বাধীনতা আবারও নতুন করে প্রাসঙ্গিক
হয়ে উঠছে । ভারত বিভক্ত করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ আড্ডায়-
আলোচনায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ঢল নেমেছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সহ তৎকালীন মুসলিম লীগ
নেতৃবৃন্দের প্রতি।
১৯৭৫ পরবর্তী প্রেক্ষাপটে নবাব সলিমুল্লাহর প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগের রাজনৈতিক আদর্শ মুসলিম
জাতীয়তাবাদের চুনকাম করা সংস্করণই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নামে
প্রতিষ্ঠার সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে তৎকালীন সময়ে জাতীকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, সফলতাও
এসেছিল। অথচ বর্তমান সময়ে তার প্রতিষ্ঠিত দলেরই গুরুত্বপূর্ণ নেতা যখন সংসদে দাড়িয়ে বলেন,
“আমি ৪৭ মানি না”, তখন আস্তর-চুনা-পলেস্তারা খসিয়ে আবারও মুসলিম জাতীয়তাবাদকে উন্মোচিত
করা সময়ের দাবী হয়ে দাড়ায়। ভারতের আগ্রাসন ও হিন্দু জাতীয়তাবাদ ক্রমশ আরও শক্তিশালী হয়ে
উঠছে যা বিভিন্ন ধর্মীয় জাতীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের নিজ ভবিষ্যতের জন্য
বিপদজনক এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের জন্য
মহা বিপদ সংকেত। বস্তুত: ভারতীয়দের একটি অংশ এখনো নেহেরু ডকট্রিন অনুযায়ী অখণ্ড ভারতের
দিবাস্বপ্ন দেখে যা তার প্রতিবেশী প্রতিটি দেশের জন্যই উদ্বেগের বিষয়।
আশা ও আনন্দের কথা জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের রাজনীতি-বিমুখ তরুণ সমাজ নতুন করে
রাজনীতি-মুখী হচ্ছে। তারা ইতিহাসের শেকড় খুঁজছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে। নতুন প্রজন্মের দায়িত্ব হবে
আবেগ প্রবণ না হয়ে, ইতিহাস, বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির আলোকে একটি
টেকসই রাজনৈতিক দর্শন খুঁজে নেয়া এবং সেই আদর্শে জাতিকে উদ্বুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করা। বাংলাদেশী
জাতীয়তাবাদ পরিমার্জিত হয়ে বাংলাদেশী মুসলিম জাতীয়তাবাদে রূপ নেবে কিনা তা নির্ধারণের দায়িত্ব
সময় ও জনগণের উপর ছেড়ে দিচ্ছি। তবে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ব্রাহ্মণ্যবাদী চরম আগ্রাসন
মোকাবেলায় আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের শেষ রক্ষাকবচ মুসলিম জাতীয়তাবাদ; মাথা উঁচু জাতী হিসাবে টিকে থাকতে হলে আমাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদেই ফিরে আসতে হবে। সুতরাং শুভস্য শীঘ্রম।
জাতীয়তাবাদ বিতর্ক যে আগামী দিনের রাজনীতিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু হয়ে উঠছে তা
অভিজ্ঞতা থেকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি।
-কাজী আবুল খায়েরমহাসচিব, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ
Bd, ml1976@gmail.com
০১৭১১০১৫৩২০