
নকআউটে আর্জেন্টিনার ম্যাচ মানেই যেন শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তা। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে দেখা মিলল সেটারই। ম্যাচের শুরুতেই লিড নিয়েও সেটি ধরে রাখতে পারল না আলবিসেলেস্তেরা। দশজনের সুইসদের বিপক্ষেও কার্যকর কিছু করতে পারছিল না। ফলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেই নিজেদের শক্তি দেখাল বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। শেষ ১০ মিনিটে জোড়া গোল করে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা।
আজ রোববার (১২ জুলাই) বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা আর সুইজারল্যান্ড। ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে সুইসদের ৩-১ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। শেষ দল হিসেবে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিল তারা।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। এর ফলও পেয়ে যায় খুব দ্রুত। ম্যাচের দশম মিনিটে লিওনেল মেসির নেওয়া কর্নার থেকে কাছের পোস্টে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে জড়ান অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। তার গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা। গ্যালারিজুড়ে তখন শুরু হয় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাস।
এই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে আরেকটি অনন্য কীর্তি গড়েন মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ১০টি অ্যাসিস্টের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে তার গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সরাসরি অবদান পৌঁছে যায় ২৮টিতে, যা তার কিংবদন্তি ক্যারিয়ারে নতুন এক সংযোজন।
প্রথমার্ধে পিছিয়ে থাকলেও বিরতির পর বদলে যায় সুইজারল্যান্ডের খেলার চিত্র। তারা একের পর এক আক্রমণ তৈরি করে আর্জেন্টিনার রক্ষণকে চাপে ফেলে। সেই চাপেরই পুরস্কার আসে ৬৮তম মিনিটে। দারুণ এক আক্রমণ থেকে গোল করে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান দান এনদোয়ে। হঠাৎই ম্যাচে ফিরে আসে সুইসরা।
তবে সমতা ফেরানোর আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ৭২তম মিনিটে নাটকীয় এক ঘটনার পর ১০ জনের দলে পরিণত হয় সুইজারল্যান্ড। ব্রিল এমবোলোর ওপর লিয়ান্দ্রো পারেদেস ফাউল করেছেন ভেবে প্রথমে ফ্রি-কিকের বাঁশি বাজান রেফারি। পরে ভিএআর পর্যালোচনায় দেখা যায়, এমবোলো ফাউলের অভিনয় করেছিলেন। এরপর সিদ্ধান্ত বদলে এমবোলোকেই হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। ম্যাচে এটি ছিল তার দ্বিতীয় হলুদ কার্ড। ফলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় সুইস এই ফরোয়ার্ডকে।
দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন এমবোলো। রেফারির সিদ্ধান্তে হতাশ সুইস স্ট্রাইকার বারবার নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সতীর্থরাও রেফারির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও সিদ্ধান্ত আর বদলায়নি।
একজন কম নিয়ে শেষ সময়টা রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত ছিল সুইজারল্যান্ড। তবে অসাধারণ লড়াই চালিয়ে যায় সুইজারল্যান্ড। অন্যদিকে, অতিরিক্ত খেলোয়াড়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে জয়সূচক গোলের খোঁজে মরিয়া হয়ে ওঠে আর্জেন্টিনা। তবে নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর কোনো দলই জালের দেখা পায়নি। ফলে ১-১ সমতায় শেষ হয় মূল সময়ের খেলা। ফলাফল নির্ধারণে খেরা গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৯৫তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে অসাধারণ বাঁকানো শটে বল জালে জড়ান হুলিয়ান আলভারেজ। গ্রেগর কোবেলের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া সেই শটে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আলবিসেলেস্তেরা। পুরো ম্যাচে নিরলস পরিশ্রমের পুরস্কারই যেন পান আর্জেন্টাইন এই ফরোয়ার্ড।
পিছিয়ে পড়ার পরও হাল ছাড়েনি সুইজারল্যান্ড। সমতায় ফেরার জন্য একের পর এক আক্রমণ চালায় তারা। এক পর্যায়ে প্রায় ৩০ মিটার দূর থেকে নেওয়া জোরালো শট এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সামনে অদ্ভুতভাবে বাউন্স করলেও অসাধারণ দক্ষতায় সেটি প্রতিহত করেন আর্জেন্টাইন গোলরক্ষক। তার সেই সেভ আর্জেন্টিনার জয় ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০১৪ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার ১১৮তম মিনিটের গোলে সুইজারল্যান্ডকে হারিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ১২ বছর পর আবারও অতিরিক্ত সময়েই সুইসদের হৃদয় ভাঙল আলবিসেলেস্তেরা।
ম্যাচের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে শেষ আঘাত হানেন লাউতারো মার্টিনেজ। দ্রুতগতির পাল্টা আক্রমণ থেকে দুর্দান্ত ফিনিশে বল জালে জড়িয়ে ৩-১ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে মেতে ওঠেন মেসিরা। আর হতাশায় মাঠ ছেড়ে যান সুইস ফুটবলাররা।
এই জয়ে টানা আরেকটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা। ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে তাদের সামনে এখন ইংল্যান্ড। কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ চার নিশ্চিত করেছে তারা।